লায়লা আরিয়ানি হোসেন : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ভাষার অধিকার আদায়ে বিদ্রোহী বিপ্লবী হয়ে ওঠার কথা, অদম্য বাংগালীর সাহসের গোড়ার কথা। ভাষার জ্ন্য ভালোবাসা, জাতিগত অধিকার সচেতনতার কথা, রয়েছে ২১ শে ফেব্রুয়ারী ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে। বাংলার অমর একুশ, বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সসম্মানে পরিচিত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হল ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এবং বহুভাষিকতাকে উন্নীত করার জন্য ২১ শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একটি বিশ্বব্যাপী পালিত উদ্যোগ।
১৯৯৮ সালে কানাডা প্রবাসী দুজন বাংগালী চিঠি লেখেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে বিশ্বের ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা দিতে। ভাষার অধিকার আদায়ে, প্রতিবাদ প্রতিরোধ আর রক্ত বিসর্জনের এই দিন, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, পৃথিবীর বুকে নজির হয়ে রয়েছে। অন্যান্য দেশের সমর্থন এবং আবশ্যক আনুষ্ঠানিকতা শেষে, ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো-এর ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আমাদের প্রাণের ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হবে বলে নিশ্চিত করা হয়।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, বহুভাষিক শিক্ষার উপর যুবসমাজের কণ্ঠস্বর । সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভাষাগত গভীর পরিবর্তন এসেছে, যা ক্রমবর্ধমান অভিবাসন, দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বহুভাষিকতার জ্ঞানের মাধ্যমে প্রাপ্ত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধার ক্রমবর্ধমান স্বীকৃতির ফলাফল। বাংলাদেশ ভাষা আন্দোলনের চেতনায় গড়া দেশ। ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, ভাষা মানেই আত্মপরিচয়। আজকের যুবসমাজ সেই চেতনাকে নতুনভাবে ধারণ করছে, প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ানো, অনলাইন কনটেন্টে শুদ্ধ ও সমৃদ্ধ ভাষাচর্চা এবং বহুভাষিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে অংশগ্রহণ, এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা, গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
“ আমার ভাইয়ের রক্তে…… আমি কি ভুলিতে পারি”-কখনোই ভুলবার নয়, বরং জানতে হবে আরো অনেক তথ্য। সেদিনের সেই আন্দোলনের আগে ও পরে, ভাইদের সাথে ছিলেন অনেক বোন। জানতে হবে তাদের কথাও। সেই ভাষা সৈনিক বোনদের উৎসর্গ করে একটি গান অন্তত কেউ লিখবেন। কণ্ঠে মায়া নিয়ে. ভালোবাসা নিয়ে গাইবেন কেউ, সে গান ও বাজবে আগামী একুশ থেকে । লেখা হবে তাদের নিয়ে গল্প, উপন্যাস, প্রামাণ্য চিত্র আর নাটক সিনেমার মাঝে সেই বোনদের সংগ্রামের কথা, ত্যাগের কথা জানবে প্রজন্ম।
শিক্ষা শুরু হয়, মাতৃভাষায়, চিন্তা চেতনা গড়ে ওঠে মাতৃভাষায়। জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে পরিচয়, মাতৃভাষায় শুরু হলে শেখা হয় অনেক সহজ। তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে কত তথ্য আজ হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বহুভাষিক শিক্ষার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে,ভাষা মানে অস্তিত্ব। আজ দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণেরা তাদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার দাবি তুলছে। এতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষিত হয়।
ডিজিটাল যুগে ভাষার চর্চা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুবসমাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্লগ, পডকাস্ট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মাতৃভাষার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বহুভাষিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। ফলে বহুভাষিক শিক্ষা এখন কেবল শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়, এটি কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক অংশগ্রহণের সঙ্গেও জড়িত। নিজের ভাষায় আত্মপরিচয়, অন্য ভাষায় বিশ্বপরিচয়।
দক্ষতা বাড়াতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ভুমিকা রাখতে, বাংলায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য খোঁজা, যাচাই করা, বিশ্লেষণ করা এবং দায়িত্বশীলভাবে শেয়ার করার সক্ষমতা। আজকের বিশ্বে এটি কেবল একটি দক্ষতা নয়; এটি শিক্ষার মৌলিক অংশ। আর এই ডিজিটাল দক্ষতার সঙ্গে মাতৃভাষা বাংলার সংযোগ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ বাংলা ইউনিকোড, বাংলা কিবোর্ড, বাংলা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, সবই প্রযুক্তিতে ভাষার অন্তর্ভুক্তির অংশ। এই বিষয়ক শিক্ষা প্রশিক্ষণ মাতৃভাষায় যত সহজে বোঝা যায়, যত বেশী মানুষের কাছে পৌঁছায়, ততোই বেড়ে যায় সুযোগ।
সেদিনের ভাষা সৈনিকদের যোগ্য উত্তরসূরী, ডাঃ মেহদী হাসান খান, ভাষা হোক উন্মুক্ত-শ্লোগানকে সামনে রেখে, এই যে ইংরেজি হরফে লিখলে হয়ে যায় বাংলা, অভ্র ফন্ট, তৈরী করেছেন। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর বন্ধুরা। শুধুই ভালোবেসে কাজটি করেছিলেন বলে, বলেছিলেন -“ভাষার জ্ন্য টাকা নেব কেন?“ এই ভালোবাসায় আজ আমরা কত মানুষ লিখে যাই অনায়াসে। অধিকার সচেতনতা, দেশ প্রেম থাকলেই এমন কাজ করা যায়। বাংলা লেখা সহজ করে দেয়া, এই অভ্র তৈরীর সাথে থাকা সবার জ্ন্য শুভেচ্ছা। তাঁরা একুশে পদকে সম্মানিত হয়েছেন, অনেক বছর পর হলেও, অনন্য উদাহারণ, ভালো কাজের সম্মান সুনিশ্চিত।
ভাষার শুদ্ধ চর্চা, ভাষার অস্তিত্ব তথা জাতিগত অস্তিত্বের জ্ন্য কতটা প্রয়োজনীয় তা বুঝতে সচেতন হতে হবে। আবেগের প্রকাশ হোক বা যেকোনো সংযোগ, ভাষার মাধ্যমে হতে হয়। গান, কবিতা, সিনেমা, সব কিছুই ভাষায় ধারন ও বর্ণনা করা হয়। গল্প করার মতো করেও ভাষার ইতিহাসের কথাগুলো যদি প্রজন্মকে জানানো যায়, বোঝানো যায়, জানবে তারা। নিজের ও সবার ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ও শুদ্ধরুপে চর্চা করা, পরিণত করতে হবে অভ্যাসে।
বাঙ্গালীর সংস্কৃতির ধারক, বাহক, বাংলা ভাষা। আঞ্চলিক রীতি নীতি, গান কবিতা, প্রথা প্রচলন, সামাজিকতা, এই সব কিছু গড়ে তোলে ইতিহাস। সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মানুষের জীবনযাপন, অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে। আর এই অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ ও সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম ভাষা। একটি অঞ্চলের প্রবাদ-প্রবচন, লোকসংগীত, ছড়া বা গল্পে সেই সমাজের জীবনদর্শন ও মূল্যবোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষার শব্দভাণ্ডারই বলে দেয় একটি জাতি কীভাবে প্রকৃতি, সম্পর্ক ও সমাজকে উপলব্ধি করে।
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে প্রযোজ্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছে,ভাষা কেবল কথোপকথনের মাধ্যম নয়, এটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। ভাষার মর্যাদা রক্ষার মধ্য দিয়ে একটি জাতি তার সংস্কৃতির সম্মান রক্ষা করে। ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক পারস্পরিক। সংস্কৃতি যেমন ভাষাকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি ভাষা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, লোকগান, পালাগান, বাউলধারা বা পহেলা বৈশাখের মতো উৎসব ভাষার মাধ্যমেই অর্থবহ হয়। ভাষা না থাকলে ঐতিহ্যের গভীরতা হারিয়ে যায়।বিশ্বায়নের যুগে বহু ভাষা বিলুপ্তির মুখে। ভাষা হারালে একটি সংস্কৃতির স্বতন্ত্রতা হারায়। ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা মানেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে ইউনেস্কো বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে এই কথা।
ভাষার মাসে আয়োজিত হয় বইমেলা। বইমেলায় যেয়ে, বাংলা বইয়ের সাথে পরিচিত হওয়াটাও নিয়মিত হওয়া দরকার। বইমেলা ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্য শহর, এবং ভারতেও অনুষ্ঠিত হয়। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, একান্তই নিজের। স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য, এই শব্দগুলোই আত্মবিশ্বাস। একুশ হয়ে উঠুক প্রতিদিনের জীবনের অংশ , ভাষার জ্ন্য ভালোবাসা হয়ে। ২১ কি করে আমাদের হলো, কি করে ২১ বিশ্ববাসীর জ্ন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো, একথা আলোচনা করতে হবে। বহুভাষিক শিক্ষা আর যুব সমাজের কন্ঠ, বাংলার বিশ্বায়ন যাত্রা রাখবে সমুন্নত। বিশ্বজুড়ে যে যেখানেই আছেন, ভাষা আন্দোলনের মতো অনন্য এই গৌরবের অর্জন ধারণ করতে হবে, ছড়িয়ে দিতে হবে, সবার মাঝে।
একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ, মানুষকে সাহসী করে তোলে। নিজের কথা বলার অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে, মানুষ শিখে নেয়, নিজের ভাগ্য নিজের হাতে গড়ার ভাষা। এই শেখাটাই আমাদের এগিয়ে নেয়। আজ যখন আমরা বলি, বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা, তখন তার পেছনে আছে অগণিত স্বপ্ন, ত্যাগ আর বিশ্বাসের ইতিহাস। এই ভাষার প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে একটি জাতির উঠে দাঁড়ানোর গল্প। ভাষা আন্দোলনের স্মারক হয়ে শহীদ মিনার মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে, স্মৃতির রাজপথে আলো হয়ে। একটি দিন বা একটি মাসের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে, যাপিত জীবনের প্রতিদিন, ভাষার জন্য ভালোবাসা থাকুক প্রতিপ্রাণে। সকল ভাষা শহীদ, ভাষা সংগ্রামীর জন্য রইলো প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। মায়ের ভাষা বাংলার জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা।
লায়লা আরিয়ানি হোসেন: বেতার কর্মী, লাইফ কোচ।